বিশ্ব চলচ্চিত্রের ইতিহাসে অনন্য উচ্চতায় আসীন কিংবদন্তি অভিনেতা রবার্ট ডুভাল আর নেই। ১৫ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রের ভার্জিনিয়ায় নিজের খামারবাড়িতে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৯৫ বছর। তার স্ত্রী লুসিয়ানা এক বিবৃতিতে জানান, প্রিয়জনদের সান্নিধ্যে, ভালোবাসা ও শান্ত পরিবেশেই তিনি বিদায় নিয়েছেন।
স্ত্রীর ভাষায়, ‘বিশ্বের কাছে তিনি ছিলেন অস্কারজয়ী শিল্পী, পরিচালক ও গল্পকার। আমার কাছে তিনি ছিলেন সবকিছু। প্রতিটি চরিত্রে তিনি নিজের সর্বস্ব উজাড় করে দিতেন। মানব আত্মার সত্যকে পর্দায় জীবন্ত করে তোলাই ছিল তার শিল্পসাধনার মূল।’
সংলাপহীন উপস্থিতি থেকে কিংবদন্তি হয়ে ওঠা
রবার্ট ডুভালের অভিনয়জীবন শুরু হয় মঞ্চনাট্য দিয়ে। নিউইয়র্কে অভিনয় প্রশিক্ষণ নেন প্রখ্যাত শিক্ষক স্যানফোর্ড মেইজনারের কাছে। সেই সময় তার সহপাঠী ও বন্ধুদের মধ্যে ছিলেন পরবর্তী সময়ের দুই কিংবদন্তি অভিনেতা—ডাস্টিন হফম্যান ও জিন হ্যাকম্যান।
চলচ্চিত্রে তার বড় অভিষেক ১৯৬২ সালে, ‘টু কিল আ মকিংবার্ড’ ছবিতে ‘বু র্যাডলি’ চরিত্রে। বিস্ময়করভাবে, চরিত্রটিতে তার কোনও সংলাপ ছিল না। তবুও তার নিঃশব্দ উপস্থিতি দর্শক ও সমালোচকদের দৃষ্টি কাড়ে। এখান থেকেই শুরু হয় এক দীর্ঘ ও সমৃদ্ধ যাত্রা।
‘গডফাদার’–এর বিশ্বস্ত আইনজীবী
১৯৭২ সালে মুক্তি পাওয়া ‘দ্য গডফাদার’ চলচ্চিত্রে টম হেগেন চরিত্রে অভিনয় করে বিশ্বব্যাপী খ্যাতি অর্জন করেন ডুভাল। পরিচালক ফ্র্যানসিস ফর্ড কপোলা তাকে প্রথমে সুযোগ দেন ‘দ্য রেইন পিপল’ ছবিতে, এরপর ‘গডফাদার’-এ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায় নেন।
পরবর্তীতে ‘দ্য গডফাদার ২’ ছবিতেও একই চরিত্রে অভিনয় করেন তিনি। সংযত, স্থির এবং গভীর আবেগপ্রবণ অভিনয়ের মাধ্যমে টম হেগেন চরিত্রকে তিনি এক অনন্য মাত্রা দেন।
‘অ্যাপোক্যালিপস নাউ’–এর ঐতিহাসিক সংলাপ
১৯৭৯ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘অ্যাপোক্যালিপস নাউ’ ছবিতে লেফটেন্যান্ট কর্নেল কিলগোর চরিত্রে তার অভিনয় চলচ্চিত্র ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে আছে। বিশেষ করে তার উচ্চারিত সংলাপ, ‘আমি সকালে বোমার গন্ধ ভালোবাসি’! যা চলচ্চিত্রপ্রেমীদের কাছে আজও কিংবদন্তি হয়ে রয়েছে।
এই চরিত্রে অভিনয়ের সময় যুদ্ধক্ষেত্রের ভয়াবহ পরিবেশকে যে দৃঢ়তায় তিনি ধারণ করেছিলেন, তা তার অভিনয়শৈলীর শক্তি ও বাস্তবতাবোধের পরিচায়ক।
অস্কারজয় ও বহুমাত্রিক প্রতিভা
১৯৮৩ সালে ‘টেন্ডার মার্সিস’ ছবিতে এক মদ্যপ বাউলের চরিত্রে অভিনয়ের জন্য শ্রেষ্ঠ অভিনেতা বিভাগে একাডেমি পুরস্কার অর্জন করেন ডুভাল। জীবনে মোট সাতবার তিনি অস্কারের জন্য মনোনীত হন।
তার আরেক উল্লেখযোগ্য কাজ ১৯৮৯ সালের টেলিভিশন ধারাবাহিক ‘লোনসাম ডোভ’। সেখানে প্রাক্তন টেক্সাস রেঞ্জার অগাস্টাস ম্যাকক্রে চরিত্রে অভিনয় করেন তিনি। এই চরিত্রটি ছিল তার নিজের কাছেও সবচেয়ে প্রিয়।
১৯৯৭ সালে ‘দ্য অ্যাপসটেল’ ছবিতে তিনি কেবল অভিনয়ই করেননি—চিত্রনাট্য রচনা, পরিচালনা ও প্রযোজনাও করেন। এতে ধর্মীয় প্রচারকের জটিল মনস্তত্ত্ব তিনি যেভাবে ফুটিয়ে তুলেছিলেন, তা সমালোচকদের উচ্চ প্রশংসা পায়।
বড় বাজেটের ছবি হোক বা স্বল্প বাজেটের স্বতন্ত্র চলচ্চিত্র—প্রতিটি ক্ষেত্রেই তিনি চরিত্রকে প্রাণবন্ত করে তুলেছেন। তার অভিনয়ের বৈশিষ্ট্য ছিল সংযম, গভীরতা এবং মানবিক সত্যের প্রতি নিষ্ঠা।
সহকর্মীদের শ্রদ্ধা
তার মৃত্যুসংবাদে শোক প্রকাশ করেছেন সহঅভিনেতা রবার্ট ডি নিরো ও আল পাসিনো। পরিচালক স্কট কুপার তাকে নিজের শিল্পজীবনের পথপ্রদর্শক হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
অভিনেত্রী ভিওলা ড্যাভিস তাকে অভিহিত করেছেন, ‘অভিনয়ের মহীরুহ’ হিসেবে। অভিনেতা অ্যাডাম স্যান্ডলার বলেন, ‘তিনি ছিলেন আমাদের সময়ের অন্যতম শ্রেষ্ঠ শিল্পী।’
অভিনেতার জীবনদর্শন
রবার্ট ডুভাল বিশ্বাস করতেন, অভিনয়ে ফলাফলের দিকে ছুটে যাওয়ার চেয়ে প্রক্রিয়ার প্রতি আস্থা রাখা জরুরি। তিনি বলতেন, ‘শূন্য থেকে শুরু করতে ভয় পেও না। চরিত্রকে সত্যি করে তুলতে হলে নিজেকে পুরোপুরি উন্মুক্ত করতে হয়।’
এক যুগের সমাপ্তি
প্রায় ছয় দশকের বেশি সময় ধরে তিনি চলচ্চিত্র জগতকে সমৃদ্ধ করেছেন। সংযত অথচ গভীর অভিনয়, চরিত্রের ভেতরে প্রবেশ করার অসাধারণ ক্ষমতা এবং ব্যক্তিজীবনে সাদামাটা স্বভাব—সব মিলিয়ে তিনি ছিলেন বিরল এক শিল্পী।
রবার্ট ডুভাল শারীরিকভাবে নেই। কিন্তু ‘গডফাদার’-এর টম হেগেন, ‘অ্যাপোক্যালিপস নাউ’-এর কিলগোর কিংবা ‘টেন্ডার মার্সিস’-এর ম্যাক স্লেজ—এই সব চরিত্র হয়ে তিনি বেঁচে থাকবেন চলচ্চিত্র ইতিহাসের পাতায়, অমলিন ও অমর হয়ে।
সূত্র: দ্য হলিউড রিপোর্টার
Leave a Reply