হোয়াটসঅ্যাপ ব্যবহারকারীদের এনক্রিপ্টেড বার্তা পড়তে পারে কি না—এমন অভিযোগের ভিত্তিতে মেটার বিরুদ্ধে তদন্ত করেছে যুক্তরাষ্ট্রের কর্তৃপক্ষ, এমনটাই জানিয়েছে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম।
এই খবরটি সামনে আসে গত সপ্তাহে দায়ের করা একটি মামলার পর। মামলায় দাবি করা হয়, হোয়াটসঅ্যাপের মালিক প্রতিষ্ঠান মেটা ব্যবহারকারীদের তথাকথিত ‘ব্যক্তিগত’ বার্তার প্রায় সবকিছুতেই প্রবেশাধিকার রাখে। তবে মেটা এই অভিযোগ সম্পূর্ণ অস্বীকার করেছে। ব্লুমবার্গকে দেওয়া এক বিবৃতিতে প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে, এই দাবি “সম্পূর্ণ মিথ্যা ও হাস্যকর”।
মেটার দাবি, এই মামলা মূলত ইসরায়েলি স্পাইওয়্যার নির্মাতা প্রতিষ্ঠান এনএসও গ্রুপকে রক্ষা করার কৌশল। উল্লেখযোগ্যভাবে, হোয়াটসঅ্যাপের দায়ের করা এক মামলায় সম্প্রতি এনএসও গ্রুপ যুক্তরাষ্ট্রের একটি ফেডারেল আদালতে হেরে যায় এবং হোয়াটসঅ্যাপের শর্ত ভঙ্গের দায়ে ১৬৭ মিলিয়ন ডলার ক্ষতিপূরণ দিতে আদেশ পায়।
মেটার বিরুদ্ধে মামলাটি দায়ের করেছে মার্কিন আইন ফার্ম কুইন ইমানুয়েল উরকুহার্ট অ্যান্ড সালিভান। তারা দাবি করেছে, অস্ট্রেলিয়া, ব্রাজিল, ভারত, মেক্সিকো ও দক্ষিণ আফ্রিকার কিছু “সাহসী” হুইসেলব্লোয়ারের কাছ থেকে পাওয়া তথ্যে এই অভিযোগ আনা হয়েছে। তবে ওই ব্যক্তিদের পরিচয় বা বিশ্বাসযোগ্যতা সম্পর্কে বিস্তারিত কিছু প্রকাশ করা হয়নি।
একই সঙ্গে বিতর্ক তৈরি হয়েছে এই কারণে যে, কুইন ইমানুয়েলই আবার আলাদা একটি মামলায় এনএসও গ্রুপের পক্ষে আপিল পরিচালনা করছে।
মেটার মুখপাত্র কার্ল উগ বলেন, আমরা এই ভিত্তিহীন মামলার জন্য কুইন ইমানুয়েলের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার চেষ্টা করছি। এটি কেবল শিরোনাম হওয়ার উদ্দেশ্যে করা হয়েছে।
লন্ডনের ইউনিভার্সিটি কলেজের নিরাপত্তা প্রকৌশল বিভাগের অধ্যাপক স্টিভেন মারডক বলেন, মামলাটি বেশ অদ্ভুত। পুরো অভিযোগই কিছু অজ্ঞাত হুইসেলব্লোয়ারের ওপর নির্ভর করছে। তাদের বিশ্বাসযোগ্যতা সম্পর্কে আমরা কিছুই জানি না। দাবিটি সত্য হলে আমি খুবই বিস্মিত হবো।
তার মতে, যদি হোয়াটসঅ্যাপ সত্যিই ব্যবহারকারীদের বার্তা পড়তে পারতো, তাহলে সেটি এতদিনে কোম্পানির ভেতর থেকেই ফাঁস হয়ে যেত।
তিনি বলেন, এমন বড় গোপন বিষয় একটি প্রতিষ্ঠানের ভেতরে দীর্ঘদিন লুকিয়ে রাখা প্রায় অসম্ভব।
ব্লুমবার্গের প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বিষয়টি তদন্ত করেছেন। তবে মন্ত্রণালয়ের একজন মুখপাত্র এই দাবিকে “প্রমাণবিহীন” বলে উড়িয়ে দেন।
হোয়াটসঅ্যাপের এনক্রিপশন কী বলে?
হোয়াটসঅ্যাপ নিজেকে একটি এন্ড-টু-এন্ড এনক্রিপ্টেড প্ল্যাটফর্ম হিসেবে তুলে ধরে। এর অর্থ হলো—বার্তা কেবল প্রেরক ও প্রাপকই পড়তে পারেন; মাঝখানে থাকা কোনো সার্ভার, এমনকি হোয়াটসঅ্যাপ নিজেও সেই বার্তা ডিক্রিপ্ট করতে পারে না।
এটি টেলিগ্রামের মতো কিছু অ্যাপের থেকে আলাদা, যেখানে বার্তা সার্ভার পর্যন্ত এনক্রিপ্টেড থাকলেও তাত্ত্বিকভাবে কোম্পানি নিজেই তা পড়তে পারে।
তবে প্রযুক্তি খাতের এক জ্যেষ্ঠ নির্বাহী গার্ডিয়ানকে বলেন, হোয়াটসঅ্যাপ বার্তার কনটেন্ট না পড়লেও ব্যবহারকারীদের মেটাডেটা— যেমন কার সঙ্গে কথা বলছে, কখন কথা বলছে, কনট্যাক্ট লিস্ট ও প্রোফাইল তথ্য—সংগ্রহ করে, যা গোপনীয়তার দিক থেকে উদ্বেগজনক।
তবুও তিনি স্পষ্ট করে বলেন, এন্ড-টু-এন্ড এনক্রিপ্টেড চ্যাটের কনটেন্ট বেছে বেছে বা পরে গিয়ে পড়তে পারা গাণিতিকভাবে অসম্ভব।
মেটার মুখপাত্র কার্ল উগ আবারও জোর দিয়ে বলেন, হোয়াটসঅ্যাপের এনক্রিপশন নিরাপদ। আমরা ব্যক্তিগত যোগাযোগের অধিকার রক্ষায় দৃঢ়ভাবে দাঁড়িয়ে থাকব।
সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান
Leave a Reply