ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রচারপর্বের মাঝামাঝি সময়ে এসে ভোট বাধাগ্রস্ত করতে ‘চক্রান্তে’র কথা তুলছে বিএনপি।
দলটির চেয়ারম্যান তারেক রহমান শেষ কয়েকটি নির্বাচনি জনসভায় বলেছেন, নির্বাচন বাধাগ্রস্ত করতে কোনো কোনো মহল ‘চক্রান্ত’ করছে। দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের মুখেও এসেছে একই অভিযোগ।
এটা কেবলই ‘পলিটিক্যাল রেটোরিক’? প্রতিপক্ষকে চাপে রাখার কৌশল? নাকি সত্যিই কোনো ধরনের উদ্বেগ কাজ করছে বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্বের মধ্যে?
বিএনপির স্থায়ী কমিটির একাধিক সদস্য এবং চেয়ারম্যানের ঘনিষ্ঠ কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলে বোঝা গেল, তাদের মূল মাথাব্যথা জামায়াতে ইসলামীর কর্মকাণ্ড নিয়ে।
>> নির্বাচন ঘনিয়ে আসার সঙ্গে-সঙ্গে জামায়াতের পক্ষ থেকে সম্প্রতি বিএনপিকে নিয়ে বেশ কিছু অভিযোগ তোলা হয়েছে। জামায়াতের নারী কর্মীদের ওপর হামলা, জামায়াত আমিরের এক্স হ্যান্ডেল ‘হ্যাক’ করার অভিযোগ তুলে ইংগিতে বিএনপিকে দায়ী করা হয়েছে।
>> শেষ সময়ে জামায়াত-এনসিপি জোট নির্বাচন থেকে সরে যেতে পারে বলে ধারণা হয়েছে বিএনপি নেতাদের মধ্যে। সেরকম কিছু ঘটলে নির্বাচন প্রশ্নবিদ্ধ হবে।
>> ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন ও গণভোটে সহায়তার জন্য ১৬ হাজার বিএনসিসি সদস্যকে যুক্ত না করার দাবি জানিয়েছে বিএনপি। দলটির নেতাদের আশঙ্কা, বিএনসিসি সদস্যদের আনা হলে তাদের মধ্যে অনেক শিবিরকর্মী ভোটের দায়িত্বে চলে আসবে।
>> ঢালাওভাবে প্রচুর সংখ্যক পর্যবেক্ষক নিয়োগ, মহানগর এলাকায় ‘অস্বাভাবিক’ ভোটার স্থানান্তর এবং ভোটের প্রচারে ধর্মীয় আবেগ ব্যবহার হচ্ছে–এসব অভিযোগ ইসির সামনে তুলেছে বিএনপি।
>> দ্বৈত নাগরিকত্বের অভিযোগ তুলে বিএনপির কয়েক ডজন প্রার্থীর বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে উচ্চ আদালতে রিট মামলা হতে পারে–এমন গুঞ্জন রয়েছে বাজারে। এটাও বিএনপি নেতাদের উদ্বেগের একটি কারণ।
বিএনপি কোথায় চক্রান্ত দেখছে জানতে চাইলে দলটির স্থায়ী কমিটির একজন সদস্য বিডিনিউজ টায়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “জামায়াত হার টের পেয়ে গেছে, তাই নির্বাচনকে বিতর্কিত করতে চায়। নির্বাচন থেকে সরে যেতে চায়। আওয়ামী লীগও রয়েছে, তারাও নির্বাচন বানচাল করতে চাইতে পারে।”
নির্বাচন নিয়ে সংকট তৈরি করতে ‘অনেক পক্ষ সক্রিয়’ বলে মনে করছেন দলের উচ্চ পর্যায়ের আরেক নেতা। তার ভাষ্য, “সবচেয়ে জটিল হচ্ছে আওয়ামী লীগকে নির্বাচনের বাইরে রাখা।
“তাছাড়া বর্তমান অবস্থায় বিএনপি ও জামায়াত মুখোমুখি অবস্থানে রয়েছে। গণভোট নিয়ে অন্তবর্তী সরকারের ওপর আস্থার সংকট তৈরি হয়েছে।”
বিএনপির উদ্বেগ আসলে কতটা-এমন প্রশ্নে দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “বিএনপির উদ্বেগ নাই। কিন্তু জিনিসগুলো পয়েন্ট আউট করতে হচ্ছে এই জন্য যে, আমাদের রাজনৈতিক কালচারের একটা প্রবলেম হচ্ছে কেউ হার হার মানতে চায় না। মানে হারার সম্ভাবনা থাকলে এক ধরনের বক্তব্য বলে। হেরে গেলে আরেক ধরনের বক্তব্য বলে।”
২০০১ সালের নির্বাচনের পর শেখ হাসিনার একটি বক্তব্যের কথা মনে করিয়ে দিয়ে তিনি বলেন, “শেখ হাসিনা যখন হেরে গেল, তখন তিনি বলেছিলেন, ‘সুক্ষ্ম কারচুপি হয়েছে’। আমাদের রাজনৈতিক নেতাদের মধ্যে এই সংকীর্ণতা আছে। রাজনীতি করবে, হারজিত থাকবে। কিন্তু ওই হারজিত গ্রহণ করতে না পারা তো রাজনীতির জন্য, গণতন্ত্রের জন্য ভালো না।
“যখন কেউ মনে করবে যে হেরে যাচ্ছে, তখন বিভিন্ন ধরনের কথা বলতে থাকে। একটা কনফিউশন সৃষ্টি করে নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ করার একটা চেষ্টা লক্ষ্য করা যায়।”
২৯ জানুয়ারি রাজশাহীতে নির্বাচনি সভায় তারেক রহমান অভিযোগ করেন, নির্বাচন নিয়ে “একটি মহল ভেতরে ভেতরে ষড়যন্ত্র” করছে।
৩১ জানুয়ারি টাঙ্গাইলের সভায় বিএনপির চেয়ারম্যান বলেন, “আপনাদের সকলের কাছে আমার আহ্বান থাকবে, এখনো কোনো কোনো মহল চেষ্টা করছে যে, কীভাবে ভোটকে বিভিন্নভাবে বাধাগ্রস্ত করা যায়।”
আগের দিন ৩০ জানুয়ারি রংপুরে বিএনপির নির্বাচনি সভায় দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সরাসরি জামায়াতের দিকে আঙুল তোলেন। তিনি বলেন, “তবে সাবধান! চক্রান্ত শুরু হয়ে গেছে। একটি দল ১৯৭১ সালে আমাদের স্বাধীনতার বিরোধিতা করেছিল, মানুষ হত্যা করেছিল। এখন আবার সেই দলটি নির্বাচন বানচাল করে দেশকে ব্যর্থ রাষ্ট্রে পরিণত করতে চায়।”
সোমবার যশোরের সভায় তারেক রহমানের অভিযোগ, “নির্বাচনকে বিতর্কিত ও বাধাগ্রস্ত করতে একটি রাজনৈতিক দল উঠে পড়ে লেগেছে। আপনাদের অত্যন্ত সতর্ক ও সজাগ থাকতে হবে।”
‘নির্বাচনের প্রচার শুরুর পর জামায়াত নারীদের সাড়া পাচ্ছে বেশ ‘–এমন প্রচারণার পর গত শনিবার জামায়াত আমির শফিকুর রহমানের এক্স হ্যান্ডেল থেকে এক ‘নারীবিদ্বোষী’ পোস্ট পরিস্থিতি ভিন্ন দিকে নিয়ে যায়।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এর তীব্র প্রতিবাদ শুরু হয়। নয় ঘণ্টা পর জামায়াতের পক্ষ থেকে বলা হয়, ওই অ্যাকাউন্ট ‘হ্যাক’ হয়েছিল। তবে তাদের ওই দাবি নিয়ে অনেকেই সন্দেহ প্রক্শ করেন।
শফিকুর রহমানের এক্স হ্যান্ডেল থেকে প্রকাশিত পোস্টে বলা হয়, “নারী প্রশ্নে জামায়াতের অবস্থান বিভ্রান্তিকর বা কুণ্ঠাবোধের নয়, বরং নীতিগত। নারীদের নেতৃত্বে আসা উচিত, এটা আমরা বিশ্বাস করি না। জামায়াতে এটা অসম্ভব। আল্লাহ এটা অনুমোদন করেননি।’
পোস্টের শেষ অংশে বলা হয়- “…আমরা বিশ্বাস করি যে, আধুনিকতার নামে যখন নারীদের ঘর থেকে বের করা হয়- তখন তারা শোষণ, নৈতিক অবক্ষয় এবং নিরাপত্তাহীনতার মুখোমুখি হয়। এটি পতিতাবৃত্তির আরেকটি রূপ ছাড়া আর কিছুই নয়।”
ওই পোস্টের স্ক্রিনশট ছড়িয়ে পড়লে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রদল বিক্ষোভ করে। বিভিন্ন দলের নারী প্রার্থীরা বিবৃতি পাঠিয়ে প্রতিবাদ করেন।
সোমবার খুলনায় বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের বক্তব্যেও জামায়াতের নারীনীতির প্রসঙ্গ উঠে আসে। তিনি বলেন, “যে দলটি নির্বাচনের আগে দেশের অর্ধেক জনগোষ্ঠীকে অসম্মানজনকভাবে কথা বলে, তাহলে আপনাদের কাছে আমার প্রশ্ন, আজকে নির্বাচনে যদি তারা কোনোভাবে সুযোগ পায়, নির্বাচন পরবর্তী সময় তাহলে তাদের আচরণ কী হতে পারে?”
এক্স অ্যাকাউন্ট ‘হ্যাক হয়েছিল’ বলে যে দাবি জামায়াতের পক্ষ থেকে করা হয়েছে, তা প্রত্যাখ্যান করে বিএনপি চেয়ারম্যান বলেন, “এ বিষয়ে যারা বিশেষজ্ঞ, তারা পরিষ্কারভাবে বলেছে যে আইডি এভাবে হ্যাক হতে পারে না। একটি রাজনৈতিক দলের একজন সিনিয়র নেতা জনগণের সামনে নির্বাচনের আগে এভাবে মিথ্যা কথা বলছে, দলটি পর্যন্ত মিথ্যা কথা বলছে তাদের আইডি বলে হ্যাক হয়ে গিয়েছিল, অথচ আইডি হ্যাক হয়নি তাদের।’
এ বিষয়ে প্রশ্ন করলে বিএনপি দিকেই সন্দেহের আঙুল তোলেন জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার।
তিনি বলেন, “শেষ মুহূর্তে নিজেদেরকে রক্ষার উপায় যতগুলো আছে, কালো টাকা, প্রশাসনকে কাজে লাগানো, সন্ত্রাস, অপপ্রচারে মিডিয়াকে ব্যবহার–সব করা হচ্ছে। যেটাকে ইয়েলো জার্নালিজম বলে, সেটা কাজে লাগিয়ে, তথ্যপ্রযুক্তির চরম অপব্যবহার করে আমাদের সম্মানিত আমির এর যে এক্স একাউন্ট হ্যাক করে দ্রুত মিথ্যাচার ছড়িয়ে দিয়ে, সাথে-সাথে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদলকে দিয়ে…।”
পরওয়ার বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “যারা সাথে-সাথে কর্মসূচি দিয়েছে তারাই ওই একাউন্টটা করেছে। বুঝতে তো আর মানুষের বাকি নেই। এগুলোই হচ্ছে চ্যালেঞ্জ। এগুলোই নির্বাচন নিরপেক্ষ হওয়ার পথে প্রতিবন্ধক। আমি মনে করি এ ব্যাপারে চিফ ইলেকশন কমিশনার, ইভেন চিফ অ্যাডভাইজার–উনাদের কঠোর হওয়ার উচিত।”
জামায়াতকর্মীদের ওপর হামলার অভিযোগ এনে তিনি বলেন, “ল এনফোর্সিং এজেন্সি যারা দায়িত্বে আছেন, এটা তাদের একটা ফেইলিওর। শেরপুরে শ্রীবর্দী উপজেলার জামায়াতের সেক্রেটারিকে কীভাবে পিটিয়ে মারল ইলেকশনের আগে। সেখানে সেনাবাহিনী ছিল, পুলিশ ছিল, কিন্তু টিল টুডে কাউকে গ্রেপ্তার করতে পারল না।
“আমাদের নারী কর্মীদের ওপর অন্তত নয়-দশ জায়গায় হামলা করা হয়েছে। বোরখা নেকাব খুলে নেওয়া হয়েছে। বিএনপির লোকেরা বক্তৃতায় বলতেছে যে দাঁড়িপাল্লার ভোট দিতে যেসব নারীরা যাবে, ভোট চাইলে তাদের কাপড় খুলে নিতে হবে। এরা ক্ষমতায় গেলে তো গোটা জাতিকে বিবস্ত্র করবে।”
মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, “হিন্দুদেরকে বলতেছে দাঁড়িপাল্লায় ভোট দিলে তোমাদের খবর আছে ১৩ তারিখ। তাহলে কি এরা দেশ ছেড়ে আবার ইন্ডিয়ায় চলে যাবে? এই আতঙ্ক এরা তৈরি করছে। সরকার সিরিয়াস না হলে এ নির্বাচন নিরপেক্ষ হওয়া নিয়ে আমাদের উদ্বেগ আছে।”
এ বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির নেতা আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আমরা তো স্বাভাবিক নির্বাচন করতেছি। আমাদের রাজনীতি হচ্ছে জনগণের আস্থা নিয়ে। কিন্তু তারা যদি শেষ মুহূর্তে সরে যায়, তাতে নির্বাচনের ক্রেডিবিলিটি নিয়ে প্রশ্ন আসবে না, তাদের ক্রেডিবিলিটি নিয়ে প্রশ্ন আসবে।”
নির্বাচন থেকে সরে যাবার মত স্পষ্ট কোনো ঘোষণা এখনও জামায়াত নেতাদের বক্তব্যে আসেনি। তবে জামায়াতের মহিলা বিভাগ ও এনসিপি নির্বাচন কমিশনে গিয়ে বিএনপির বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দিয়ে এসেছে।
এনসিপির মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভুঁইয়া রোববার রংপুরে এক সভায় বলেছেন, “একটি সেটেলমেন্টের মধ্য দিয়ে যেটা আগে থেকে বোঝা যাবে, অমুক প্রধানমন্ত্রী হচ্ছে বা অমুক দল নির্বাচিত হচ্ছে। যদি এ ধরনের কোনো নির্বাচন করার চেষ্টা হয়, তাহলে ১১–দলীয় জোট যে কোনো ধরনের কঠোর সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য প্রস্তুত আছে।”
Leave a Reply